পিরোজপুরে জমজমাট ভাসমান পেয়ারা বাজারে পর্যটকের ভিড়
পিরোজপুর প্রতিনিধি : পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলা আটঘর কুড়িয়ানা গ্রাম। দেশজুড়ে সমাদৃত এখানকার পেয়ারার ভাসমান বাজারের ঐতিহ্য। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পেয়ারা বাগানকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর নেছারাবাদে ছুটে আসেন হাজারও পর্যটক। জমজমাট হয়ে উঠে পেয়ারার বাগানসহ গোটা অঞ্চল।চাষী আমল বলেন, ”তাদের অর্থ উপার্জনের প্রধান পেয়ারা চাষ, এবছর পেয়ারার ফলন ভাল, দাম কম, পরিচর্যায় খরচ বেশি, অন্যদিকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, তাদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। সরকারের আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ এবং কৃষি কর্মকর্তাদের সময়োপযোগী পরামর্শসহ হিমাগার স্থাপন হলে ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন”।বরিশাল বিভাগের নেছারাবাদের সীমানালগ্ন, বানারিপাড়া ও ঝালকাঠির সদর পিরোজপুরের নেছারাবাদের কুড়িয়ানা, আটঘর, গণপতিকাঠি, মাদ্রা, আতা,জামুয়া, জৌসার, মুসলিমপাড়া, শশীদ, আন্দাকুল, আদাবাড়ি, আদমকাঠি, জিন্দকাঠি, কাঠুরাকাঠি, ধলহার, ডুমুরিয়া, ভিমরুলীর, শতদশকাঠি, বাউকাঠি সহ প্রায় ২৪টি গ্রামে প্রায় চাঁর হাজারাধিক পেয়ারারা চাষি অনেকটা নিরুদ্বেগ দিন কাটলেও শ্রাবণ,ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পেয়ায়ার সমারোহে ডিঙি ও পানসি নৌকায় তিন জেলার মোহনা খাল ভিমরুলীর ভাসমান বাজারে দেশ-বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় কষ্টের কথা ভুলে যান চাষীরা। ভিমরুলী, ডুমুরিয়া, শতদশকাঠি এ তিনটি খালের মোহনায় এ ভাসমান পেয়ারার বাজারটি অবস্থিত প্রায় শত বছর আগে। পেয়ারা বাগানগুলোতে ছোট-ছোট লেকের মত খালে ডিঙা নৌকায় বাগানের দুই পাড়ের পেয়ারা তুলে চাষি ও কৃষানীরা। পাইকারি দামে বিক্রয়ের জন্য তরতাজা পেয়ারার শতশত জলবাজারে নৌকা যেন দৃষ্টিনন্দিত। প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও সোমাবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোটি কোটি টাকার পেয়ারা এ জলবাজারের বেচা-কেনা হয়। পুরুষদের পাশাপাশি নারীও আর্থিকভাবে এ পেশায় স্ববলম্বী হয়েছেন। পেয়ারা মৌসুমে নারী-পুরুষ পর্যটক ও ব্যবসায়ীসহ নানা ধরনের মানুষ আসেন এ জলবাজারে।ভাসমান বাজারটি শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান যা পর্যটকদের কাছেও ভ্রমণের আকর্ষণীয় স্থান। জলবাজারটি হঠাৎ করে দেখলে মনে হতে পারে থাইল্যান্ড, ও ভিয়েতনাম জল বাজারের চেয়েও অধিক অনবদ্য। ছোট-ছোট ডিঙি নৌকার দৃষ্টি নন্ধিত পেয়ায়ার ভাসমান বাজার দেখে যে কেউর মনে হতে পারে জলের সাথে জলযান, আর জল জীবনের এখানকার মানুষের রাত ফোটা বেচে থাকার স্বপ্ন। পচনশীল পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য হিমাগার না থাকায় চাষীদের পড়তে হয় অনেকটা নিরুদ্বেগে।বরিশাল বিভাগীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, তিনটি উপজেলায় ২৩টি গ্রামে ৭৭৮ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ হাজার ২শ’২০টি পেয়ারার বাগান রয়েছে। এসব বাগানের পরিচর্যা থেকে শুরু করে ফল বেচা-কিনা পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার শ্রমজীবী মানুষ জড়িত। এর মধ্যে নেছারাবাদেই ৬০১ হেক্টর জমিতে ১০৭৬টি পেয়ারা বাগানে রয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে প্রায় ১০টন পেয়ার উৎপাদন হয়। পিরোজপুর সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবছর ৭৭৮ হেক্টর জমিতে ৮ হাজার ৭ শত ৮০ টন পেয়ারা ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।চাষি বিনয় হালদার বলেন, হিমাগারের অভাবে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার পেয়ারা নষ্ট হয়। কুড়িয়ানার বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষক কালীদাশ মন্ডল বলেন, আমার ৪টি পেয়ারার বাগান রয়েছে, পেয়ারা মৌসুমে প্রায় ৩ টন পেয়ারা চাষ হয়। ৫০ বছর যাবত পেয়ারার ভাসমান বাজারের পেয়ারা বিক্রয় করে লাভবান ছিলাম। বর্তমানে প্রতি মন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পাইকারি দামে বিক্রয় করায় তেমন একটা লাভ হচ্ছে না”।ভিমরুলী ভাসমান পেয়ারারা বাজারে হাজারীবাগ থানার ফল আড়তদার আলম-গফুর বলেন, মন প্রতি ৫ শত টাকা পাইকারি ধারে ভাসমান বাজার থেকে পেয়ারারা কিনে ৬ শত থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি করায় তেমন একটা ভাল হয় না। বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) এর সূত্রে জানা যায়, ১৫ শতকের ১ম দিকে সর্বপ্রথম আমেরিকার উত্তর ফ্লোরিডায় স্থানীয় ফলের গাছ হিসাবে স্ট্ররেরি পেয়ারার সন্ধান পাওয়া যায়। ১৭ শতকের শেষ পর্তুগিজরা সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে পেয়ারার চাষ প্রচলন শুরু করে।আটঘর গ্রামের প্রবীণ পেয়ারা চাষি নিখিল মন্ডল বলেন, নেছারাবাদে পেয়ারারা চাষের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই, কথিত আছে নেছারাবাদে আন্দাকুল গ্রামে পূর্ণচন্দ্র মন্ডল ১৮৪৩ সালে ভারতের বিহার রাজ্যের গয়া কাশীতে তীর্থ করতে গিয়ে পেয়ারার কিছু বীজ সংগ্রহ করে নিজ এলাকা আন্দাকুল ও আটঘর কুড়িয়ানায় ১৮৪৪ সালে প্রথম পেয়ারার চাষ শুরু করেন। জনশ্রুতি আছে ১৮৫১ সালে গাছে ফল ধরন শুরু করলে স্থানীয় ভাষায় নাম রাখা হয় পূর্ণমন্ডলী জাত ফল, পরেুগয়া” বা গৈইয়া”পরবর্তীতে দেশ ব্যাপী পেয়ারা নামে পরিচিতি হয়”। বেকার যুবক ও চাষীরা পর্য়াক্রমে পরিত্যক্ত জমিতে কযয়কটি গ্রামে পেয়ারা বাগান তৈরি করে।পিরোজপুর কৃষি অফিস সূত্র জানায়, ১৮৯৬ সালে বাণিজ্যিকভাবে এলাকাভিক্তিক পেয়ারা চাষ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে নৌপথে খুলনা, ফেনী, সিলেট, মাদারীপুর, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পেয়ারারা বাণিজ্যিকভাবে রপ্তনি হয়। ১৯৮৭ সালে ব্যাপক ফলনে সারাদেশের চাহিদা মিটিয়ে উন্নতমানের জেলি তৈরির কাঁচামাল হিসাবে পেয়ারারা বহির্বিশ্বে ও রপ্তানি শুরু হয়-কলম্বিয়া, পর্তুগাল, নেপাল, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, ভার্মা, ভুটন, আফগানিস্তান, আরব-আমিরাত, মালদ্বীপ, বুলগেরিয়া, ইরাক, ইরান, ইংল্যান্ডসহ ১৭টি রাষ্ট্রে পেয়ারা রফতানি হত। বছরে প্রায় ৮০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হত। পচনশীল এ ফলটি সংরক্ষণের হিমাগার না থাকা, সাকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, কৃষি অধিদপ্তর অসহযোগিতা বিভিন্ন প্রতিকূতার কারণে ২০২০ সালে পেয়ারারা বহির্বিশ্বে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পেয়ারা কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে দুঃসময় পার করছে চাষীরা।সংশ্লিষ্ট দপ্তর পিরাজপুর জানায়, পচনশীলপেয়ারা সংরক্ষনের জন্য হিমাগার না থাকায় কৃষিখাতে প্রতিবছর প্রায় কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। নেছারবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দত্ত বলেন, আটঘর কুড়িয়ানায় এলাকাটি প্রাকৃতিক ও পরিবেশ-সংবেদনশীল এলাকা হওয়ায় স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ও পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণের স্বার্থে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে এবং পেয়ারার বাগানে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহনশীল হতে হবে। পর্যাটকদের নিরাপত্তার জন্য সকল ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি অফিসার মাহাফুজুর রহমান বলেন, পেয়ারারা সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে হিমাগার নির্মাণ করার জন্য ঊর্ধ্বতম কর্মকর্তা জনানো হবে। এব কৃষিকদের সব ধরনের সহায়তা আমরা করে থাকি।
৩০ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যা ০৬:১৪:৫১