আলমগীর মানিক, রাঙামাটি প্রতিনিধি: চলমান শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টির অনুপস্থিতিতে তীব্র তাপদাহের কারণে রাঙামাটিস্থ কাপ্তাই হ্রদের পানি অস্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে গেছে। পানি না থাকায় হ্রদের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। ইতিমধ্যেই রাঙামাটি সদরের সঙ্গে পাঁচ উপজেলা বাঘাইছড়ি, লংগদু, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি ও বরকল উপজেলায় চলাচল করা যাত্রীবাহী লঞ্চ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
উপজেলাগুলোতে নৌ-যানে লোকজনের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন কষ্টসাধ্য হওয়ার ফলে বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। জৈষ্ঠ্যের খরতাপে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। তীব্র তাপদাহের এই শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। সুপেয় পানির জন্য কয়েক মাইল হেঁটে তাদের খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে হ্রদ নির্ভর বাসিন্দাদের।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চরমভাবে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। হ্রদের বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর ও টিলা। কয়েক মাইল হেঁটে নৌ-ঘাটে আসতে হচ্ছে তাদের। যাত্রী ও মালামাল ছোট ইঞ্জিন বোটের মাধ্যমে পরিবহন করা হচ্ছে। তারপরও শুভলংয়ের পরে গিয়ে বোটগুলো আটকে যায়। ২ থেকে ৩ ঘণ্টার রাস্তা যেতে সময় লাগছে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা।
রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় ৫টি উপজেলার সাথে নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জানা গেছে, হ্রদে পানির স্তর এখন অনেক নিচে নেমে গেছে। হ্রদের নাব্যতা কমে যাওয়ায় এবং হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে কমে গেছে কাপ্তাই জল বিদ্যুতের উৎপাদনও।
পাকিস্তান সরকারের আমলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে সৃষ্টি হয় সাতশ’ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশ্বের দীর্ঘতম কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ। ১৯৬২ সালে কাপ্তাইয়ে নির্মিত কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বর্তমানে ৫টি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা মোট ২৪২ মেগাওয়াট। উজানে পর্যাপ্ত পানি থাকলে সবগুলো ইউনিট চালু থাকে। কিন্তু এখন মাত্র একটি ইউনিট চালু আছে, যা থেকে বিদ্যুৎ মিলছে দিনে ২৫ মেগাওয়াট।
কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, কাপ্তাই হ্রদে বর্তমানে যে পানি আছে, তাতে একটি মাত্র ইউনিট চালু রাখা সম্ভব। সেটিও চালু রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি পরিশোধনের কথা বিবেচনায় রেখে। পানি ৭০ এমএসএলের নিচে নামলে সেটিও চালু রাখা সম্ভব হবে না।
উজান থেকে নেমে আসা পলিমাটি এবং পাহাড় হতে ধসে পড়া মাটি কাপ্তাই হ্রদের তলদেশে জমা হচ্ছে। এ কারণে হ্রদের তলদেশ ইতিমধ্যে অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে এবং হ্রদের সার্বিক পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম জলাধার এই কাপ্তাই হ্রদের নাব্যতা কমে যাওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে নানা সমস্যা। ফলে রাঙামাটি তথা দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত পণ্য আহরণ, পর্যটন এবং শস্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যা রাঙামাটি জেলার অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ করছে।
কাপ্তাই হ্রদ কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে সচল রাখতে অনতিবিলম্বে হ্রদের তলদেশে জমাটবদ্ধ পলিমাটি অপসারণে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিংয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2024, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available