রাঙামাটি প্রতিনিধি: পাহাড়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ, চালু হয়েছে ই-লার্নিং কার্যক্রম, তৈরি হয়েছে শিক্ষাকেন্দ্র, নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প। অথচ এসব উদ্যোগের পরও রাঙামাটির উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে হতাশাজনক চিত্র। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জেলার ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া ৫ হাজার ৩৫৯ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ১ হাজার ৭১৪ জন। পাসের হার ৩১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ১৫ জন।
প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলার ২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টিতেই কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাননি। এমনকি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ১০ শতাংশেরও নিচে। নানিয়ারচর সরকারি কলেজে ৭ দশমিক ৭২, কাচালং সরকারি কলেজে ৭ দশমিক ৮৫ এবং ঘাগড়া কলেজে পাসের হার মাত্র ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। অন্যদিকে সুজনী ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাঁচ পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেননি।
জেলার সর্বোচ্চ পাসের হার বাংলাদেশ নৌবাহিনী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাপ্তাইয়ে ৯৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। রাঙামাটি সরকারি কলেজে পাসের হার ৬১ শতাংশ হলেও রাঙামাটি সরকারি মহিলা কলেজে ২৮ দশমিক ৩২ এবং রাঙামাটি পাবলিক কলেজে মাত্র ২৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
এই ফলাফল পাহাড়ের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রকল্প ও অবকাঠামোগত উদ্যোগ থাকলেও সেগুলোর সুফল শিক্ষার্থীদের ফলাফলে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম জনপদে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের দক্ষ শিক্ষকের সংকট কাটাতে ই-লার্নিং কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বড় প্রত্যাশা নিয়ে। ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ১২টি বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। পরে ২৩ আগস্ট প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে নির্মিত ই-লার্নিং সেন্টার উদ্বোধন করেন। ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় অনলাইন পাঠদান।
কিন্তু প্রকল্পটির পরিচালনা, একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা, শিক্ষক নির্বাচন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে শিক্ষক নির্বাচন ও পাঠদানের ধারাবাহিকতা কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। প্রকল্পের ব্যয়, বাস্তব অগ্রগতি এবং শিক্ষার্থীদের শেখার মান যাচাইয়ে স্বাধীন মূল্যায়নের বিষয়টিও এখনো জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলোর উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে শুধু প্রকল্প গ্রহণ, উদ্বোধন, ভবন নির্মাণ কিংবা অনলাইন ক্লাস চালু করলেই শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল মূল্যায়ন। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের ব্যয়, শিক্ষক নির্বাচন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশেষ করে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের শিক্ষা খাতে নেওয়া প্রকল্পগুলোর বাস্তব সুফল কতটা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছেছে, তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ই-লার্নিং কার্যক্রমের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে কী পরিবর্তন এসেছে, সেটিও প্রকাশ করা উচিত।
পাহাড়ের শিক্ষার এই ফলাফলকে কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই মন্তব্য করে অত্রাঞ্চলের শিক্ষানুরাগীরা বলছেন, এবারের ফলাফল বিপর্যয়ের বিষয়টি পাহাড়ের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও তদারকির কার্যকারিতা যাচাইয়ের একটি সতর্কবার্তা। প্রশ্ন হচ্ছে, এত উদ্যোগ ও প্রকল্পের পরও যদি তিনজন পরীক্ষার্থীর মধ্যে দুজনই অকৃতকার্য হন, তাহলে এসব কর্মসূচির সুফল কোথায়?
এটিভি/ এইচকে
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available