অনলাইন ডেস্ক: সাইবেরিয়ার প্রাচীন যাযাবর জনগোষ্ঠী সিথীয়রা প্রায় ২ হাজার ৮০০ বছর আগে নেশার জন্য গাঁজা ব্যবহার করত। রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় অবস্থিত একটি সমাধিসৌধে গাঁজার ১ হাজার ৪০০টির বেশি বীজ এবং মানুষের চুলে গাঁজার নেশা সৃষ্টিকারী উপাদানের রাসায়নিক চিহ্ন পেয়েছেন গবেষকেরা। তাদের দাবি, নেশার উদ্দেশ্যে গাঁজা ব্যবহারের এটিই এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ।
এ বিষয়ে গবেষকেরা জানান, রাশিয়ার প্রত্যন্ত তুভা প্রজাতন্ত্রের উয়ুক উপত্যকায় বিশাল এক সমাধিসৌধে এসব নিদর্শনের সন্ধান মিলেছে। প্রায় ১৪০ মিটার ব্যাসের এই সমাধিসৌধটি দক্ষিণ সাইবেরিয়ায় অবস্থিত। সিথীয় সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সমাহিত করতে এটি ব্যবহার করা হতো। ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করা এবং সোনার অলংকার ও সামগ্রী তৈরিতে দক্ষতার জন্য পরিচিত ছিল সিথীয়রা। ইউরেশিয়ার তৃণভূমি জুড়ে তুলনামূলক যাযাবর জীবনযাপন করত তারা।
গাঁজা বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত সাইকোঅ্যাক্টিভ (মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারকারী) উদ্ভিদগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে প্রাগৈতিহাসিক যুগে গাঁজা কীভাবে ব্যবহৃত হতো, তা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ণয় করা বেশ কঠিন। উদ্ভিদটির বিভিন্ন অংশ—যেমন ফুল, পাতা ও রজন—সহজেই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সেগুলো খুব কমই টিকে থাকে। জানা যায়, গাঁজা বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতো। যেমন—তেল ও তন্তু (আঁশ) উৎপাদনে। অর্থাৎ, এটি কেবল ওষুধ বা নেশাজাতীয় দ্রব্য হিসেবেই ব্যবহৃত হতো না।
বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্সেস এবং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব জিওঅ্যানথ্রোপলজির ড. জিনো কাসপারির নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল দক্ষিণ সাইবেরিয়ার তুভা প্রজাতন্ত্রে অবস্থিত একটি রাজকীয় সমাধি নিয়ে গবেষণা করেছে। এ গবেষণায় বিভিন্ন বিশ্লেষণত্মাক পদ্ধতির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।
সমাধিটি ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের অশ্বারোহী সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত সিথীয় সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের। সেখান থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি গাঁজার বীজ পাওয়া গেছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বয়স নির্ধারণ করে গবেষকেরা জানতে পেরেছেন, বীজগুলো খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতকের শুরুর দিকের। অর্থাৎ, এগুলোর বয়স প্রায় ২ হাজার ৮০০ বছর।
প্রত্নতাত্ত্বিক ও গবেষণাটির প্রধান লেখক কাসপারি বলেন, বীজগুলো প্রমাণ করে যে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার-অনুষ্ঠানে গাঁজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
গবেষক দলটি কেন্দ্রীয় সমাধি কক্ষ থেকে পাওয়া সংরক্ষিত মানবচুলও পরীক্ষা করেছে। এসব নমুনার বিশ্লেষণে গাঁজা ব্যবহারের রাসায়নিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কাসপারি বলেন, এই গবেষণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে উদ্ভিদের অবশেষ বিশ্লেষণের সঙ্গে মানবদেহে থাকা আণবিক চিহ্নের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।
তার ভাষ্য, মানুষের চুল গাঁজার টিএইচসি ও সিবিডির মতো উপাদান শোষণ করে। এ কারণেই চুলের নমুনা পরীক্ষা করে মাদক গ্রহণের প্রমাণ খোঁজা সম্ভব হয়। তবে চুলের রাসায়নিক চিহ্ন থেকে গাঁজা কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল, তা জানা যায় না। পরবর্তী সময়ের আঞ্চলিক নিদর্শনগুলো থেকে ধারণা করা হয়, গাঁজা পুড়িয়ে এর ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করা হতো।
গবেষকদের অভিমত, সমাধিসৌধে গাঁজার উপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিক আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবেই এটি ব্যবহার করা হতো। সমাধিসৌধটি তৈরি করা হয়েছিল লার্চগাছের গুঁড়ি ও কাদামাটি দিয়ে। পুরো স্থাপনাটি ঢেকে রাখা হয়েছিল হাজার হাজার টন পাথর দিয়ে। এর ভেতরে সিথীয়দের প্রাণীর অবয়বভিত্তিক শিল্পরীতিতে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী এবং বেশ কিছু ব্যতিক্রমী সোনার বস্তু পাওয়া গেছে।
ক্যাসপারী জানান, সমাধিসৌধের ওপরের অংশে সিথীয়রা পশু বলি দিত। সেখানে কয়েক ডজন ঘোড়ার বলি দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ছড়িয়ে থাকা মানুষের হাড় দেখে ধারণা করা হচ্ছে, মানুষেরও বলি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও জানান, বড় একটি সমাধিতে গাঁজা পাওয়া যাওয়ার অর্থ, বিষয়টিকে অবশ্যই আচার-অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সমাধিসৌধের ওপরের অংশে পশু ও মানুষ বলি দিয়ে এক ধরনের প্রতীকী অশ্বারোহী শোভাযাত্রা তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। খুঁটির ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা ঘোড়া ও মৃত অশ্বারোহীদের এভাবে প্রদর্শন করা হতো। তৃণভূমির সমাজে এটি ছিল চরম সামাজিক ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি উপায়।
এটিভি/ এইচকে
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available